সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

world-history-by-generation.jpg

সত্য চির উদ্ভাসিত ইতিহাসের বাঁকে মুক্তির সন্ধ্যান

এই সমস্ত মানব সৃষ্ট দর্শনের ভিত্তি যে সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান তাও তো মানুষেরই কল্পিত জ্ঞানেরই ফসল। ফলে সমাজবিজ্ঞান আর রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গবেষনালব্ধ জ্ঞান বা ফলাফল বিজ্ঞানের মূল শাখার মত সুনির্দিষ্ট না হওয়ায় মানব সৃষ্ট দর্শনের কার্যকারিতা তাই সব সময় সুনির্দিষ্ট পথ বেয়ে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছতে সমর্থ হয় না।

পাশ্চাত্তের বিজ্ঞান মনস্ক বর্তমান বিজ্ঞান নির্ভর বা বিজ্ঞান ভিত্তিক জীবন ব্যবস্থায় বিশ্বাসী, সে কারণে ধর্ম চিন্তা বা ধর্মীয় দর্শনকে সেকেলে বলে ক্রমাগত ভাবেই পেছনের দিকে ঠেলে দিতে শুধু উৎসাহই বোধ করছে না রীতিমত চর্চ্চাশীলও বটে! আর তাদের কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে তারস্বরে কোরাস গাইছে বিশ্বের বাদ-বাকী জনপদের বর্তমানও। যদিও আপাতদৃষ্টিতে তাদের সামনে কোন কল্যাণময় দর্শনই বর্তমান নয়, তথাপিও তারা অযথাই স্ববিরোধীতার সঙ্কটে হাবুডুবু খাচ্ছে!  

বিজ্ঞান বলতে আমরা সাধারণতঃ পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত, জ্যামিতি ইত্যাদিকে বুঝে থাকি। কারণ বিজ্ঞানের এই সব শাখাগুলো গবেষনার মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট একটা ফলাফলে পৌঁছতে সমর্থ হয়, যার সাহায্যে নানা রকম বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার পৃথিবীর মানুষকে বহুলাংশেই কল্যাণের পরশ বুলায়, যদিও অনেক সময় বিপরীত অবস্থারও সৃষ্টি করে। তবে বড় কথা হলো, বিজ্ঞান নিয়ে যারা চর্চ্চা করেন, তাঁরা নিজেরা কেউ বিজ্ঞানের সেই অবদান কে মানুষের কল্যাণে সরাসরি কার্যকর করার জন্য রাজনৈতিক পরিমন্ডলে বিচরণ করেন না। অর্থাৎ সচেতন ভাবেই রাজনীতিকে তাঁরা এড়িয়ে চলেন। তাহলে তো প্রশ্ন উঠতেই পারে, তাদের দর্শন বা জীবন ব্যবস্থা বিজ্ঞান ভিত্তিক হলো কী ভাবে?

তারও যুক্তি হয়তো তাদের কাছে থাকতেই পারে। যেমন - আধুনিক বিশ্ব সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস-ঐতিহ্যকে মন্থন করে যে দর্শন সৃষ্টি করে তার পক্ষ্যে অনেক যুক্তিই তারা দাঁড় করাতে পারে। আর এই সমস্ত বিজ্ঞানের উপর ভিত্তি করেই তারা বিজ্ঞান ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের অহম বোধে উদ্দীপ্ত হয়ে ধর্মীয় বিশ্বাস, মূল্যবোধ, চেতনাকে সেকেলে বলে অবজ্ঞা করার দুঃসাহসে মরিয়া হয়ে নিজেদের পারঙ্গমতাকে শীর্ষস্থানে প্রতিস্থাপনে ক্রমাগত ব্যর্থ চেষ্টা করে যায় মাত্র। যার পরিণতিতে আশা ব্যঞ্জক ফলাফল প্রাপ্তিতে ব্যর্থ হয়ে হতাশায় ডুবে যায়। এটাই হ’লো বাস্তবতা।

এই সমস্ত মানব সৃষ্ট দর্শনের ভিত্তি যে সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান তাও তো মানুষেরই কল্পিত জ্ঞানেরই ফসল। ফলে সমাজবিজ্ঞান আর রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গবেষনালব্ধ জ্ঞান বা ফলাফল বিজ্ঞানের মূল শাখার মত সুনির্দিষ্ট না হওয়ায় মানব সৃষ্ট দর্শনের কার্যকারিতা তাই সব সময় সুনির্দিষ্ট পথ বেয়ে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছতে সমর্থ হয় না। ফলে মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয় এক ধরণের হতাশা, যা থেকে সৃষ্টি হয় সমাজে বিশৃঙ্খলা।  

বিজ্ঞানের মূল শাখার আলোচ্য বিষয় বা গবেষনার বিষয় বস্তু সাধারণতঃ জড় পদার্থই হয়ে থাকে আর থাকে হিসাব-নিকাশ, যার নিজস্ব কোন ইচ্ছা নেই, অনুভূতিহীন নিস্প্রাণ বস্তু মাত্র। যার প্রতিটি অনু-পরমানুই একই বৈশিষ্টের অধিকারী। কিন্তু যে মানব জাতিকে নিয়ে সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সৃষ্টিশীল(!) আয়োজন, সেই মানুষ তো বিবেক, বুদ্ধি ও আত্মা সম্পন্ন সচল প্রাণী, যাদের মাঝে সমষ্টিগত ভাবে মন-মানষিকতার বৈশিষ্টের কোন মিল বা ঐক্য নেই। ফলে এই বিজ্ঞান সুনির্দিষ্ট কোন ফলাফলের নিশ্চয়তা বিধানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয়।

তবে এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও আছে। বর্তমান যাকে সেকেলে বলে উপেক্ষা করতে খুবই পছন্দ করে, যাকে অবৈজ্ঞানিক বলে হেলা-ফেলা করে এড়িয়ে যেতে চায়, তা হ’লো মহা-বিজ্ঞানময় দর্শন, আল-কোরআন। বহু মনীষীর বহু দর্শন বা মতবাদ এ যাবৎ কাল আলোচনার শীর্ষে যেমন এসেছে তেমনি আবার তীর্যক সমালোচনার মুখে কোনঠাসাও হয়ে পড়েছে। বহু বিশ্বাসের সূর্য আবার অস্তমিতও হয়েছে। কিন্তু আল-কোরআনে বর্ণিত দর্শন, মতবাদ বা জীবন ব্যবস্থার কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি আজ পর্যন্তও চিহ্নিত করার দুঃসাহস কারও হয়নি। কারণ মানব জাতির মন-মেজাজ ও তার বৈশিষ্ট যিনি তৈরী করেছেন, তার পথ চলার নির্দেশিকা স্বরূপ মহা-বিজ্ঞানময় মহাগ্রন্থ, আল-কোরআনও তিনিই রচনা করেছেন। তাই এ দর্শনের কোন ব্যর্থতা নেই। দেশ-কাল-পাত্র ভেদে এর ফলাফলে কোন ব্যত্যয়ও ঘটে না। এটাই চিরন্তন সত্য মহা দর্শন।

তারপরও মানুষ সুপথ হারিয়ে ভুল পথে পা বাড়ায়। যার আভাস আমরা বিশ্ব স্রষ্টা মহান আল্লাহ্তা’লা‘র কাছ থেকেই পেয়ে থাকি। মানুষের চেতনায় আল্লাহ কর্তৃক সন্নিবেশিত হয়েছে বিবেক, যা ভাল-মন্দের বাছ-বিচারের ক্ষমতাপ্রাপ্ত। পাশাপাশি তার সামনে রয়েছে লোভ-মোহ, হিংসা-বিদ্বেষের মত বিভ্রান্তি সৃষ্টি কারী অসৎ চিন্তা। যে সমস্ত কারণ গুলোই মানুষের কর্ম ফলের প্রাপ্তি হিসাবে যোগ-বিয়োগ হবে ইহলৌকিক জীবনাবসানের পরবর্তী অধ্যায়ে, এই খানেই বিশ্বাসের প্রশ্ন, যা মানুষকে বিভাজিত করে দেয়। এই খানেই মানুষের মাঝে বিভেদের দেয়াল তুলে দিয়েছে ত্যাগ আর ভোগের বিশ্বাস ও আকাঙ্খা।

অসৎ চিন্তাশীল ব্যক্তির বিবেক পরিচালিত হয় ভোগবাদী মানষিকতার চেতনায় লালিত দর্শন দ্বারা, যে দর্শন তাকে বিশ্বাসহীনতার আবর্তে নিমজ্জিত করে রাখে। প্রাচুর্যের হাতছানী তাকে চাকচিক্যময় প্রতারণার ফাঁদে পা দিতে উদ্বুদ্ধ করে। তার চিন্তার জগৎ জুড়ে বিচরণ করে সেই সব যুক্তি, যা তার নিজেকে সঠিক বলে প্রমাণে সহায়ক। স্রষ্টার স্রষ্টা কে? এই প্রশ্নও তার সত্যকে সত্য বলে স্বীকার করে নেবার শক্তি কেও দুর্বল করে রাখে। তার চেয়েও বড় যে সত্য সৃষ্টি জগৎ যে গতিশীল হিসেবে দৃশ্যমান সেটাও তার মনকে আন্দোলিত করে না! সৃষ্টির লক্ষ, উদ্দেশ্য ও তার পরিণতির ভাবনাও তার জন্য চিন্তার কোন খোরাক যোগায় না।

এ ভাবেই মানুষ ও মানুষের সমাজ পরিবর্তিত হয়। যে পরিবর্তন প্রাথমিক অবস্থায় মানুষের কাছে বোধগম্য হয় না। কিন্তু এই পরিমানগত পরিবর্তনের সমষ্টি যখন গুনগত পরিবর্তনের আকারে আমাদের সামনে উপস্থিত হয় তখনই মনে হয় সমাজ বদলে গেছে অর্থাৎ এক সময়ের দৃষ্টিনন্দন সমাজ ব্যবস্থা থেকে মানুষের ক্রম বিচ্যুতির ফলে সমাজ যখন বিষ বৃক্ষে পরিণত হয় তখনই আমরা বুঝতে পারি যে, নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় মানব সমাজকে খাদের কিনারে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে! তথাকথিত উন্নত ও আধুনিক বিশ্বের মানুষ গুলো যখন সেখান থেকে শান্তির অন্বেষায় পিছু হঠার আবশ্যিকতা অনুভব করছে, আমরা তখন সে দিকেই ধেয়ে চলছি কৃত্রিম সুখের সন্ধ্যানে!

টুইন টাওয়ার ধ্বংশযজ্ঞ যে পরিকল্পিত একটা গভীর ষড়যন্ত্রেরই বহিঃপ্রকাশ ছিল, সেটা এখন দিবালোকের মতই স্পষ্ট। আর সেটাই ছিল ইতিহাসের দারুন এক ইঙ্গিতবাহী বাঁক। সেই বাঁক থেকেই বিশ্ব মানব সমাজ নতুন পথের দিক-নির্দেশনা খুঁজে পাবার তাগিদ অনুভব করছে, যার ফলশ্রুতিতে বিশ্ব মানব সমাজের মাঝে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে, দলে দলে মানুষ শত ঝুঁকি উপেক্ষা করেও ইসলামের দিকেই ঝুঁকে পড়ছে। এখানেই বিশ্ব স্রষ্টা মহা বিজ্ঞানী আল্লাহতা’লা’র অহংকার ও চমৎকারীত্ব, যার কাছে আত্ম সমর্পন করার মাঝেই আমাদের মুক্তি নিহিত।


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

ইতিহাস, মুসলিম, পৃথিবী, মানুষ, বর্তমান, অতীত, জীবন, পাশ্চাত্য, প্রাচ্য, সভ্যতা, আধুনিক