সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

the-three-questions-leo-tolstoy.jpg

মূল: কউন্ট লিও টলস্টয় তিনটি প্রশ্ন

রাজা ঘুরে দেখলেন বন থেকে এক গুঁফো লোক দৌড়ে আসছে। লোকটা হাত দিয়ে তার পেট চেপে ধরে আছে। পেট থেকে রক্ত পড়ছে। গোঙাতে গোঙাতে রাজার সামনে এসে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেল।

একবার রাজার মনে হল, ঠিক কখন কোন কাজটা শুরু করতে হবে এটা যদি আগে থেকে জানা যেত। যদি আগে থেকে বোঝা যেত ঠিক কার কথা শোনা উচিত আর কারটা না। আর সবচেয়ে বড় কথা, কোন কাজটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এটা যদি আগে থেকে টের পাওয়া যেত, তাহলে কোন কিছুতেই ব্যর্থ হতে হত না।

এই চিন্তা মাথায় আসার পর রাজা রাজ্য জুড়ে ঢেঁড়া পিটিয়ে দিলেন। যে রাজাকে এই তিনটা প্রশ্নের উত্তর শিখিয়ে দিতে পারবে, তাকে অনেক পুরষ্কার দেয়া হবে।

রাজ্যের সব জ্ঞানী গুণী লোক এগিয়ে এল। কিন্তু একেক জনের উত্তর একেক রকম।

প্রথম প্রশ্নের উত্তরে কেউ বলল, অনেক আগে থেকেই দিন মাস বছরের হিসাব করতে হবে। তার উপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা করতে হবে। সেই পরিকল্পনা সুচারুভাবে অনুসরণ করতে হবে, তাহলেই কেবল আগে থেকে জানা সম্ভব কোন কাজ কখন করতে হবে। আবার কেউ বলল, আগে থেকে জানা অসম্ভব। তবে অলসভাবে বসে না থেকে যদি কোথায় কখন কি হচ্ছে সে ব্যাপারে খোঁজখবর রাখা যায়, তাহলে হয়ত সে বুঝতে পারা যাবে কখন কি করতে হবে। আবার অনেকে বলল, যতই খোঁজখবর রাখা হোক, একজনের পক্ষে সব কাজের সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব না। তবে জ্ঞানী গুণী শিক্ষিত লোকেদের একটা কাউন্সিল যদি থাকে, তবে তাদের পক্ষে সম্ভব।

আবার অন্যকিছু লোক বলল, তারপরও কথা থেকে যায়। সব ঘটনা কাউন্সিলের সামনে আনা সম্ভব না। কিছু ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে আগে থেকে জানা থাকতেই হবে। একমাত্র জাদুকরদের পক্ষেই সম্ভব আগে থেকে জানা। তাই কাউন্সিলে একজন জাদুকরকেও রাখতে হবে।

দ্বিতীয় প্রশ্নের ক্ষেত্রেও বহুমুখী উত্তর পাওয়া গেল। কেউ বলল মন্ত্রীপরিষদের কথাই রাজার শোনা উচিত। কেউ বলল পুরোহিতের কথা, কেউ ডাক্তার। আবার কিছু লোক যোদ্ধাদের প্রয়োজনীয়তার কথাও ব্যাখ্যা করল।

তৃতীয় প্রশ্নের বেলায়, কোন কাজটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ: কিছু উত্তর করল বিজ্ঞান। কেউ বলল সামরিক দক্ষতা আবার অনেকে বলল ধর্মীয় উপাসনা।

উত্তর এমন বহুধাবিভক্ত হওয়ায় রাজা কাউকেই পুরষ্কার দিলেন না। কিন্তু তারপরও সঠিক উত্তর জানার ইচ্ছাটা রাজার মনে রয়েই গেল। জ্ঞানের জন্য প্রসিদ্ধ এক সন্ন্যাসীর কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন রাজা।

এই সন্ন্যাসী এক বনে থাকেন। বন ছেড়ে কখনো বের হন না, আর শুধু সাধারণ লোকদের সাথেই দেখা করেন। তাই রাজা সাধারণ বেশে বেরোলেন। সন্ন্যাসীর কাছে পৌঁছাবার আগেই ঘোড়া আর দেহরক্ষীদের রেখে গেলেন।

সন্ন্যাসী তার ঘরের সামনে মাটি কোপাচ্ছিলেন। রাজাকে দেখে সম্ভাষণ জানালেন। কিন্তু মাটি কোপানো বন্ধ করলেন না। শারীরিকভাবে সন্ন্যাসী বেশ দুর্বল ছিলেন, কুপিয়ে মাটি তুলে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছিলেন।

রাজা এগিয়ে গিয়ে বললেন: ‘হে জ্ঞানী ঋষি, আপনাকে তিনটি প্রশ্ন করতে এসেছি। আমি কিভাবে সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করা শিখতে পারি? কাদের কথাকে অন্যদের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত আমার? কোন বিষয়ের উপর আমার মনোযোগ বেশি দেয়া উচিত?’

রাজার কথা শুনলেও কোন উত্তর দিলেন না সন্ন্যাসী। হাতে থুতু ছিটিয়ে আবার মাটি কোপাতে শুরু করলেন।

‘আপনি ক্লান্ত,’ রাজা বললেন। ‘কোদালটা আমাকে দিন আমি আপনার কাজ এগিয়ে দিচ্ছি।’

‘ধন্যবাদ,’ বলে রাজার হাতে কোদাল দিয়ে মাটিতে বসে পড়লেন সন্ন্যাসী।

কিছুক্ষণ কুপিয়ে রাজা থেমে গেলেন। আবার সন্ন্যাসীকে প্রশ্নগুলো করলেন। এবারেও সন্ন্যাসী কোন উত্তর দিলেন না। উঠে কোদালের দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন,

‘এখন কিছুক্ষণ বিশ্রাম করুন, আমি কাজ করি।’

রাজা কোদাল না দিয়ে আবার মাটি কোপাতে শুরু করলেন। একঘণ্টা গেল, দু’ঘণ্টা গেল। সূর্য গাছপালার আড়ালে হারাতে শুরু করেছে। রাজা কোদালটা শেষবারের মত মাটিতে গেঁথে বললেন,

‘জ্ঞানী ঋষি, আমি আপনার কাছে এসেছি আমার প্রশ্নের উত্তরের জন্য। উত্তর আপনার জানা না থাকলে বলুন আমি বাড়ি ফিরে যাই।’

‘কেউ একজন দৌড়ে আসছে,’ সন্ন্যাসী বললেন।

রাজা ঘুরে দেখলেন বন থেকে এক গুঁফো লোক দৌড়ে আসছে। লোকটা হাত দিয়ে তার পেট চেপে ধরে আছে। পেট থেকে রক্ত পড়ছে। গোঙাতে গোঙাতে রাজার সামনে এসে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। রাজা আর সন্ন্যাসী তার কাপড় সরিয়ে একটা আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেলেন। রাজা তার রুমাল আর সন্ন্যাসীর তোয়ালে দিয়ে যথাসম্ভব পরিষ্কার করে ক্ষতস্থানটা বেঁধে দিলেন। কিন্তু রক্ত বন্ধ হচ্ছিল না। রাজা বারবার ধুয়ে বেঁধে দিচ্ছিলেন। একসময় রক্ত পড়া বন্ধ হল। মানুষটা উঠে পানি খেতে চাইল। রাজা খাবার পানি এনে তাকে দিলেন। এরমধ্যে সূর্য ডুবে ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে। রাজা আর সন্ন্যাসী মিলে আহত লোকটিকে ঘরে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলেন। লোকটা ঘুমিয়ে পড়ল। সারাদিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত রাজাও দরজার কাছেই শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। একঘুমে গ্রীষ্মের এই ছোট রাত পার করে দিলেন। সকালে রাজার ঘুম ভাঙল। তার বুঝতে বেশ কিছুটা সময় লাগল তিনি কোথায়। আর তার পাশে শুয়ে তার দিকে গভীর এবং উজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে থাকা এই গুঁফো লোকটাই বা কে।

‘আমাকে ক্ষমা করে দেবেন,’ রাজাকে জেগে উঠতে দেখে দুর্বল স্বরে বলল লোকটা।

রাজা বললেন, ‘আমি আপনাকে চিনি না। সুতরাং ক্ষমা করার প্রশ্নও ওঠে না।’

‘আপনি আমাকে চেনেন না, কিন্তু আমি আপনাকে চিনি। আমি আপনার শত্রু। আপনি আমার ভাইকে হত্যা করে তার সম্পত্তি নিয়ে নিয়েছিলেন। তাই আমি প্রতিশোধ গ্রহণের শপথ নিয়েছিলাম। আমি জানতাম আপনি ঋষির কাছে একা এসেছেন। ফেরার পথে আপনাকে হত্যা করার পরিকল্পনা ছিল আমার। দিন প্রায় শেষের পথে। তখনও আপনি ফিরছেন না দেখে আমি আড়াল ছেড়ে আপনাকে খুঁজতে বেরোই। বেরিয়েই আপনার দেহরক্ষীদের সামনে পড়ে যাই। তারা আমাকে চিনে ফেলে এবং আঘাত করে। আমি কোনরকমে পালিয়ে আসি। রক্তক্ষরণে আমি মারাই যেতাম যদি না আপনি আমার ক্ষতস্থান বেঁধে দিতেন। আমি আপনাকে মারতে এসেছিলাম আর আপনি আমার জীবন বাঁচালেন। যদি আমি বাঁচি, এবং যদি আপনি চান, আমি এবং আমার সন্তানরা আজীবন আপনার বিশ্বস্ত দাস হয়ে থাকব। আমাকে ক্ষমা করবেন।’

এভাবে শত্রুকে বন্ধু হিসেবে পেয়ে রাজা খুবই খুশি হলেন। রাজা তাকে ক্ষমা করলেন। তার নিজস্ব কর্মচারি এবংচিকিৎসককে তার দেখাশোনার জন্য পাঠাবেন বললেন। এছাড়াও কথা দিলেন তার সম্পত্তিও ফিরিয়ে দেবেন।

আহত লোকটির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রাজা সন্ন্যাসীকে খুঁজতে বারান্দায় এলেন। বিদায় নেবার আগে আরেকবার তিনি প্রশ্নগুলো করতে চান। হাঁটু গেড়ে বসে আগের দিনের কোপানো মাটিতে বীজ বুনছেন সন্ন্যাসী।

রাজা এগিয়ে গিয়ে তাকে বললেন, ‘জ্ঞানী ঋষি, শেষবারের মত প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে এসেছি।’

‘উত্তর তো আপনি পেয়ে গেছেন!’ হাঁটু গাড়া অবস্থাতেই সামনে দাঁড়ানো রাজার দিকে তাকিয়ে বললেন সন্ন্যাসী।

‘পেয়ে গেছি? মানে?’ রাজা প্রশ্ন করলেন।

‘আপনি বোঝেন নি,’ উত্তর দিলেন সন্ন্যাসী। ‘আমার দুর্বলতা দেখে আপনি সহমমর্িতা দেখিয়েছেন। আমার হয়ে মাটি কুপিয়েছেন। তা না করে যদি নিজের মত চলে যেতেন, লোকটা আপনাকে আক্রমণ করত। আপনি আফসোস করতেন আমার সাথে থাকেন নি বলে। যখন মাটি কোপাচ্ছিলেন ওটাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়, আমি ছিলাম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ এবং আমাকে সাহায্য করাটাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তারপর, আহত লোকটা যখন আমাদের দিকে দৌড়ে আসল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল যখন লোকটার দেখাশোনা করছিলেন। কারণ আপনি যদি তখন তার ক্ষতস্থান বেঁধে না দিতেন, আপনার সাথে শান্তি স্থাপন না করেই সে মারা যেত। তাই, সে ছিল সেই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। তার জন্য আপনি যা করেছেন, সেই সময়ে তা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। মনে রাখবেন, একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ সময় হচ্ছে - এখন! এই সময়টা গুরুত্বপূর্ণ কারণ একমাত্র এই সময়টাতেই আমাদের পক্ষে কিছু করা সম্ভব। যেই মানুষটার সাথে আপনি আছেন, সেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ আপনি জানে না আর কার সাথে আপনার দেখা হবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে সাথের মানুষটিকে সাহায্য করা। কারণ, মানুষকে এই জীবনে পাঠানোই হয়েছে মানুষকে সাহায্য করার জন্য।’


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

গল্প, লিও, তলস্তয়, তিনটি, প্রশ্ন, রাজা, রাজ্য, উত্তর, সন্ন্যাসী, প্রতিশোধ, দেহরক্ষী