সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

carmilla-3.jpg

মূল: জোসেফ শেরিডান লে ফ্যানু কারমিল্যা - পর্ব ৩

ডাক্তার ড্রইংরুমে এসে যে রিপোর্ট দিল সেটা রোগীর জন্য ভালই বলতে হবে। মেয়েটা এখন উঠে বসেছে, নাড়ির গতিও স্বাভাবিক, সব ঠিকই আছে বলা যেতে পারে। তেমন কোন আঘাতের চিহ্নও নেই, কোন ক্ষতি ছাড়াই মানসিক ধাক্কাটা সামলে উঠেছে।

পড়ুন গল্পের ১ম২য় পর্ব

তুলনা
কুয়াশাচ্ছন্ন বনের ভেতর যতক্ষণ না দলটা হারিয়ে গেল আমরা তাকিয়ে থাকলাম; নিস্তব্ধ রাতে ঘোড়ার খুর আর গাড়ির চাকার শব্দও একসময় ফুরিয়ে গেল।

এতক্ষণ যে এই ঘটনাগুলো ঘটে গেল, মেয়েটা ছাড়া তার আর কোন চিহ্নও রইল না। আর তখনই মেয়েটা চোখ খুলল। আমার দিকে না থাকায় আমি মেয়েটার মুখ দেখতে পাইনি, তবে মেয়েটা মাথা তুলে সম্ভবত ওর মাকে খুঁজল, আমি শুনতে পেলাম খুব সুন্দর একটা কণ্ঠ অভিযোগের সুরে জিজ্ঞেস করছে, মা কোথায়?

ভালমানুষ ম্যাডাম পেরোডন নরম সুরে জবাব দিলেন আর মেয়েটাকে আশ্বস্ত করারও চেষ্টা করলেন।

তারপর আমি আবার মেয়েটাকে প্রশ্ন করতে শুনলাম:

: আমি কোথায়? এটা কোন জায়গা? তারপর আবার বলল,
: আমি তো গাড়িটাকেও দেখছি না; আর মাত্সকা, ও কোথায়?

মাদাম ধৈর্য্য সহকারে ও যাতে বুঝতে পারে এমন ভাবে ওর সব প্রশ্নের উত্তর দিলেন, গাড়ির ভেতরে বা বাইরে আর কেউ আহত হয়নি শুনে ও খুবই খুশী হল, আর ওর মা তিন মাসের জন্য ওকে এখানে রেখে গেছে শুনে কেঁদে ফেলল।

মাদাম পেরোডনের সাথে সাথে আমিও মেয়েটাকে সান্ত্বনা দেবার জন্য এগোতে যেতেই মাদমোয়াজেল ডে লা-ফন্টেইন আমার বাহুর উপর তার হাত রেখে বললেন:

: এখনই যেওনা, একজন একজন করে ওকে কথা বলতে দাও, নাহলে ও সামলাতে পারবে না।

ঠিক করলাম ও সুস্থির হয়ে বিশ্রামের জন্য বিছানায় যাওয়া মাত্র আমি ওর ঘরে গিয়ে ওর সাথে আলাপ জমাব।

এর মধ্যে বাবা একজন লোক পাঠিয়ে দিয়েছে মাইল দু’য়েক দূরের সেই ডাক্তারকে খবর দেয়ার জন্য আর মেয়েটার থাকার জন্য একটা ঘরও ঠিকঠাক করা হচ্ছে।

মাদামের হাতে ভর দিয়ে মেয়েটা উঠে দাঁড়াল, ধীরে ধীরে ঝুলনসেতুর উপর দিয়ে দূর্গদ্বারের দিকে হেঁটে গেল।

হলঘরে চাকররা মেয়েটার জন্য অপেক্ষা করছিল, মেয়েটা পৌঁছানো মাত্র ওকে ওর ঘরে নেয়া হল।

আমাদের ড্রইং রুমটা বেশ লম্বা, চারটা জানালা, যেগুলো দিয়ে পরিখা আর ঝুলনসেতুর ওপর দিয়ে বনটা দেখা যায়।

আসবাবপত্র পুরনো ওক কাঠের, কাঠের কেবিনেটগুলোর ওপর কারুকাজ করা, চেয়ার গুলো লালরঙের ডাচ ভেলভেট দিয়ে মোড়া। দেয়ালগুলো পর্দা দিয়ে ঢাকা, এবং চারদিকে সোনালী ফ্রেম দিয়ে ভরা, অনেক বড় বড় ফ্রেমগুলোর গায়ে শিকার এবং উৎসবের বিভিন্ন ছবি আঁকা। আহামরী আরামদায়ক কিছু না, তবে এখানেই আমরা চা খাই, আর দেশাত্ববোধের কারণে বাবার মত, কফি আর চকলেটের সাথে আমাদের দেশীয় পানীয় থাকা উচিত।

আজ রাতেও আমরা এখানে বসলাম, মোম জ্বালানো হয়েছে, আর সন্ধ্যার ঘটনাগুলো নিয়েই আমরা কথা বলছিলাম।

মাদাম পেরোডন আর মাদমোয়াজেল ডে লা-ফন্টেইন দু’জনই আমাদের সাথে বসেছেন। আমাদের অতিথিকে বিছানায় শোয়ানো মাত্রই সে ঘুমিয়ে পড়েছে, একজন চাকরকে দায়িত্ব দিয়ে আমার গভর্ণেসরা চলে এসেছেন।

মাদাম ঢোকা মাত্র আমি প্রশ্ন করলাম,
: আমাদের অতিথিকে কেমন দেখলেন? আমাকে ওর সব কথা বলবেন?
: মেয়েটাকে আমার খুবই পছন্দ হয়েছে - মাদাম উত্তর দিলেন
: আমার জীবনে এত সুন্দর মেয়ে কখনো দেখিনি; তোমার বয়সী হবে, চমৎকার এবং খুব ভদ্র।
: আসলেই অনেক সুন্দর - মাদমোয়াজেল যোগ করলেন, মেয়েটার ঘরে একফাঁকে উঁকিও দিয়েছিলেন।
: আর কি সুন্দর কন্ঠ! - মাদাম পেরোডন মনে করিয়ে দিলেন।

মাদমোয়াজেল জিজ্ঞেস করলেন,
: গাড়িটা দাঁড় করানোর পর ভেতরের মহিলাটাকে দেখেছিলেন,  বাইরে বের হয়নি, জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল।
: না, আমরা দেখিনি তাকে।

তখন তিনি কিম্ভুত দেখতে এক কালো মহিলার বর্ণনা দিলেন, মাথায় রঙিন আচ্ছাদন দেয়া, গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরের সব কিছু দেখছিল, মাথা নাড়ছিল আর বিচিত্র ভঙ্গিতে হাসছিল। সাদা চোখের মণি যেন খুশিতে জ্বলছিল আর দাঁতগুলোও কেমন যেন।

ম্যাডাম জিজ্ঞেস করলেন, সাথের লোকগুলো কেমন বদখত দেখতে খেয়াল করেছিলেন?

বাবা ঘরে ঢুকেই বললেন, হ্যাঁ, দেখতে এত বিদঘুটে, আমি আমার জীবনে দেখিনি। বনের ভেতর ভদ্রমহিলার সব লুটে না নিলেই হল। এরা খুব চালাক হয়, মিনিটের ভেতর সব লুটে নিয়ে যায়।

: আমার তো মনে হয় লম্বা যাত্রায় ওরাও ক্লান্ত - মাদাম বললেন।
: বিচ্ছিরি তো বটেই, এছাড়াও, লম্বা, কালো চেহারাগুলো কেমন যেন অদ্ভুত। আমার কেন জানি বিস্তারিত জানতে ইচ্ছে করছে, বেচারি মেয়েটা কাল যদি কিছুটা সুস্থ হয়, আমরা হয়ত কিছু জানতে পারব।
: আমার মনে হয় না মেয়েটা কিছু বলবে - মুখে একটা রহস্যময় হাসি নিয়ে আর মাথা একটু ঝুঁকিয়ে বাবা বলল। মনে হচ্ছে বাবা এর চেয়েও বেশি জানে, কিন্তু বলতে চাচ্ছেনা।

চলে যাওয়ার আগে দিয়ে কালো ভেলভেট পরা মহিলার সাথে বাবার কি কথা হয়েছিল তা জানার জন্য আমি অস্থির হয়ে গেলাম।

আমরা একা হওয়া মাত্র বাবাকে চেপে ধরলাম। বেশি জোরাজুরি করতে হল না।

: তোকে না বলার তেমন কোন কারণ আমি খুঁজে পাচ্ছি না। ভদ্রমহিলা তার মেয়ের দেখভালের দায়িত্ব আমাদের ঘাড়ে চাপাতে চাইছিলেন না, কারণ একে তার মেয়েটার স্বাস্থ্য দূর্বল, তায় মানসিক অবস্থাও কিঞ্চিত নাজুক, তাই বলে মৃগী রোগ বা পাগলামি নেই, বরং মানসিক ভাবে পুরোই সুস্থ।
: কি অদ্ভুত সব কথা! - আমি অবাকই হলাম।
: এসব বলার কোন মানেই হয় না।
: কিন্তু এই কথাগুলোই বলা হয়েছে - বাবা হাসল,
: যেহেতু তুই সব শুনতে চাচ্ছিস তাই বলছি, কিন্তু আদপে বেশি কিছু বলার নেই। এরপর ভদ্রমহিলা বললেন,
: আমি খুবই গুরুত্বপূর্ণ আর লম্বা একটা যাত্রায় যাচ্ছি -কথাটার উপর জোর দিয়েছিলেন - জরুরি এবং গোপনীয়; তিন মাসের ভেতর আমি আমার মেয়ের জন্য ফিরে আসব; এইসময়ের ভেতর আমার মেয়ে, আমরা কে, কোথা থেকে এসেছি, কোথায় যাচ্ছি, এসব ব্যাপারে মুখ বন্ধ রাখবে।’ এই পর্যন্তই। ভদ্রমহিলা নিখুঁত ফরাসী ভাষায় কথা বলছিলেন। উনি ‘গোপনীয়’ শব্দটা বলে কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। উনার বক্তব্য পরিষ্কার করলেন এভাবে। এরপর কত দ্রুত চলে গেলেন দেখলি। মেয়েটার দেখভালের দায়িত্ব নিয়ে আশা করি ভুল করিনি।

আর আমার কথা বলব, আমি তো খুশি; ডাক্তার কখন আসবে কখন যাবে, আর আমি মেয়েটার সাথে দেখা করব, কথা বলব, সেই অপেক্ষায় বসে আছি। তোমরা যারা শহরে থাক, তারা চিন্তাও করতে পারবে না, এমন নিস্তরঙ্গ যায়গায়, নতুন কোন বন্ধুর সাথে প্রথম পরিচয়ের ব্যাপারটা কত উত্তেজনার।

ডাক্তার আসতে আসতে একটা বেজে গেল; কিন্তু আমি এখনই ঘুমোতে যেতে চাইনা। এর চেয়ে নরং পায়ে হেঁটে কালো ভেলভেটের সেই রাজকুমারীর গাড়ির পেছনে পেছনে দূরে যেতেও রাজি ।

ডাক্তার ড্রইংরুমে এসে যে রিপোর্ট দিল সেটা রোগীর জন্য ভালই বলতে হবে। মেয়েটা এখন উঠে বসেছে, নাড়ির গতিও স্বাভাবিক, সব ঠিকই আছে বলা যেতে পারে। তেমন কোন আঘাতের চিহ্নও নেই, কোন ক্ষতি ছাড়াই মানসিক ধাক্কাটা সামলে উঠেছে। চাইলে আমি ওর সাথে এখন দেখা করতে পারি, তাতে কোন অসুবিধে নেই। এটা শুনে আমি কয়েক মিনিটের জন্য দেখা করার অনুমতি চেয়ে পাঠালাম।

চাকরটা সাথেসাথেই ফিরে এসে বলল, মেয়েটা দেখা করতে খুবই আগ্রহী।

নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ, আমি সাথে সাথে এই অনুমতির সুযোগ নিলাম।

আমাদের অতিথি দূর্গের সবচেয়ে সুন্দর একটা ঘরে শুয়ে আছে। একটু হয়ত বড় ঘরটা। বিছানার বিপরীত দেয়ালে পর্দা ঝুলছে, সেখানে ক্লিওপেট্রা বুকে সাপ নিয়ে শুয়ে আছে; অন্যান্য দেয়ালে আরও জাঁকজমকপূর্ণ কিছু দেয়ালপর্দা ঝুলছে, অবশ্য ঝাপসা হয়ে গেছে। কিন্তু সোনার কারুকাজ আর জমকালো রঙের ব্যবহারের কারণে পুরনো দেয়ালপর্দাগুলোর মলিনতা চোখে পড়ে না।

বিছানার পাশে মোম জ্বলছে। মেয়েটা বসে আছে; নরম সিল্কের ড্রেসিংগাউনটা ওর সুন্দর শরীরের সাথে মানিয়ে গেছে, ফুলের কাজ করা, প্রান্তগুলো মোটা সিল্ক দিয়ে মোড়া। এটাই মেয়েটার মা তার মেয়ের গায়ের উপর দিয়েছিলেন।

আমি কাছে গিয়ে আমার পক্ষ থেকে মেয়েটাকে শুভেচ্ছা জানাতে গিয়েও কেন হঠাৎ বোবা হয়ে গেলাম এবং দু’পা পিছিয়ে এলাম? বলছি।

আমি আমার ছোটবেলার রাতে দেখা সেই মুখটা দেখতে পেয়েছিলাম, যে মুখটা আমার স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে আছে, কেউ টের পায় না, কিন্তু সেই ভয়টা এখনো আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।

সুন্দর, অনেক সুন্দর; আমি প্রথম যেমন দেখেছিলাম, তেমনি একটা বিষাদমাখা অনুভূতি।

সেই মুখে হঠাৎ চিনতে পারার একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল।

আমি না পারলেও প্রায় এক মিনিটের নিরবতার পর মেয়েটা কথা বলে উঠল।

: কি আশ্চর্য! - ও বিস্ময় প্রকাশ করল।
: বারো বছর আগে, তোমার চেহারা স্বপ্নে দেখেছিলাম, তারপর থেকে দৃশ্যটা আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
: আশ্চর্যই বটে! - অনেক কষ্টে যে ভয়টা এতক্ষণ আমাকে স্থবির করে রেখেছিল, সে ভয়টাকে দমিয়ে উত্তর দিলাম।
: বারো বছর আগে, সত্যির মত মনে হলেও, আমি তোমাকেই দেখেছিলাম। তোমার চেহারাটা আমি কখনো ভুলতে পারিনি। সব সময় আমার চোখের সামনে তোমার চেহারাটা ভাসত।

মেয়েটার মুখের হাসিটা নরম হয়ে এল। শুরুতে হাসিতে অদ্ভুত কিছু একটা থাকলেও এখন আর সেটা সেখানে নেই, হাসি আর মুখ দুটোই অনিন্দ্যসুন্দর এবং বুদ্ধিদীপ্ত হয়ে উঠল।

একটু আশ্বস্ত হলাম, তার এই হঠাৎ আগমনে আমরা আনন্দিত এবং আমি ব্যক্তিগত ভাবে কত খুশি এসব বলে আতিথেয়তা দেখানোর চেষ্টা করলাম। 

আমি ওর হাত ধরলাম। এমনিতে নি:সঙ্গ মানুষেরা যেমন হয়, আমি তেমনি লাজুক, কিন্তু তখন আমি স্বচ্ছন্দ, এমনকি সাহসীও বলা যেতে পারে। ও-ও আমার হাত ধরে মৃদু চাপ দিল, চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, আমার দিকে তাকিয়ে হাসল, একটু লজ্জাও পেল মনে হয়।

ও-ও আন্তরিক ভাবে আমার সম্ভাষণের জবাব দিল। আমি ওর পাশে বসা, তখনও কৌতুহলী; ও বলল:

: তোমাকে যে দেখেছিলাম, সেই ঘটনাটা আমার বলা উচিত; ব্যাপারটা অদ্ভুত তাই না, আমরা দু’জনই একজন আরেকজনকে দেখেছিলাম, স্বপ্নতো না যেন সত্যি, আমি তোমাকে আর তুমি আমাকে, এখনকার চেহারায়, অথচ তখন আমরা দু’জনই ছোট। আমার বয়স তখন ছয় হবে, বিচিত্র একটা স্বপ্ন দেখে আমার ঘুম ভেঙে গেল, নিজেকে একটা ঘরে আবিষ্কার করলাম, আমার নার্সারীর মত না, গভীর বনের ভেতর, ঘরে কাবার্ড, বিছানা, চেয়ার, বেঞ্চ এসব আছে। মনে হল বিছানা খালি আর ঘরেও আমি ছাড়া আর কেউ নেই; আমি চারদিকে ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম, একটা লোহার মোমদানি খুব ভালো লেগেছিল, ওটার আবার দু’টো শাখাও ছিল, বিছানার নিচেও একটা ছিল, আমি বিছানার নিচ থেকে বেরোতেই কারো কান্নার আওয়াজ পেলাম; আমি তখনও হাঁটু গেড়ে বসা, ওপরে তাকাতেই তোমাকে দেখতে পেলাম-ঠিক তোমাকেই দেখেছি-এখন যেমন দেখছি; এক সুন্দরী তরুণী, সোনালী চুল আর বড় বড় নীল চোখ, আর ঠোঁট-তোমার ঠোঁট-তুমি, এখনকার মতই। তোমাকে দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম; বিছানায় উঠে তোমাকে জড়িয়ে ধরলাম, আমরা দু’জনেই বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। একটা চিৎকার শুনে ঘুম ভেঙে গেল; তুমি উঠে বসে চিৎকার করছিলে। আমি ভয় পেয়ে নিচে নেমে গেলাম, মনে হয় কিছুক্ষণের জন্য জ্ঞানও হারিয়েছিলাম; জ্ঞান ফিরতেই দেখি আমি বাড়িতে, আমার নার্সারীতে। এরপর থেকে তোমার চেহারা আমি ভুলতে পারিনি। এটা শুধু চেহারার মিল না, তোমাকেই আমি দেখেছিলাম সেই রাতে।

এবার আমার পালা আমার গল্পটা বলার; অনাবিল বিস্ময় মাখানো মুখে আমার নতুন সঙ্গী পুরো গল্পটা শুনল।

-“জানিনা আমাদের কার কাকে বেশি ভয় পাওয়া উচিত,” ও আবার হাসতে হাসতে বলল। “তুমি যদি আরেকটু কম সুন্দর হতে, আমি বোধহয় তোমাকে তখন ভয় পেতাম, কিন্তু এই তুমি, আর আমি সমবয়সী, এবং বারো বছর আগে থেকে আমরা একজন আরেকজনকে চিনি, সুতরাং আমার বিশ্বাস আমাদের পরস্পরের উপর একটা আলাদা দাবি তৈরি হয়েছে; ঘটনাপ্রবাহে মনে হচ্ছে, ছোটবেলা থেকেই এটা আমাদের নিয়তি যে আমরা বন্ধু হব। আমি জানিনা আমার মত তুমিও টান অনুভব করছ কিনা, কিন্তু আমার কখনো কোন বন্ধু ছিল না-এবার কি আমি একজন বন্ধু পাব?” ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওর সুন্দর গাঢ় চোখের তীব্র দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকাল।

সত্যি হচ্ছে আমিও এই অচেনা মেয়েটার প্রতি ব্যাখ্যাতীত আকর্ষণ অনুভব করছি। আমারও মনে হচ্ছে, ও যেমন বলল তেমন, “টান অনুভব করছি”, কিন্তু এছাড়াও একটা অনিচ্ছাও যেন কাজ করছে। যাই হোক, এমন বিপরীত মুখী অনুভূতির দ্বন্দে আকর্ষণটাই জয়ী হল। কৌতুহল জাগিয়ে তুলে ও আমাকে জিতে নিয়েছে, ও এত সুন্দর! আর সহজেই যে কাউকে আপন করে নিতে পারে।

ওর ভেতর ক্লান্তির ছাপ পড়তে দেখে আমি তাড়াতাড়ি বিদায় নিতে উঠলাম।

: ডাক্তার বলেছে আজ রাতে একজন মেইডকে তোমার সাথে রাখতে; আমাদের একজন মেইড বাইরে অপেক্ষা করছে, ও খুবই কাজের আর একদমই বিরক্ত করবে না।

: অসংখ্য ধন্যবাদ, কিন্তু ঘরে কেউ পাহারায় থাকলে আমি ঘুমোতে পারব না। আমার কাউকে লাগবে না – আর আমার দূর্বলতার কথাটা বলেই দেই, আমি ডাকাত খুব ভয় পাই। একবার আমাদের বাড়ি ডাকাত পড়েছিল, দু’জন চাকর মারাও গিয়েছিল, এরপর থেকে আমি সবসময় দরজা বন্ধ করে শুই। ব্যাপারটা আমার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে-তোমাকে দেখেই বুঝতে পারছি তুমি খুব ভালো, দয়া করে আমাকে ভুল বুঝোনা। দরজার চাবিটাও আছে দেখতে পাচ্ছি।

ও ওর সুন্দর হাতে আমাকে জড়িয়ে ধরে কানে কানে বলল,
: শুভরাত্রি, ডার্লিং, তোমার কাছ থেকে আলাদা হতে ইচ্ছে করছে না, তবুও শুভরাত্রি; একটু বেলা করে হলেও কাল দেখা হবে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বালিশে ডুবে গেল, ওর আন্তরিক দৃষ্টি আমাকে দেখতে লাগল, ও আবারো বলল,
: শুভরাত্রি, প্রিয় বন্ধু।

তারুণ্য, পছন্দ করে, ভালোবাসে, মুহুর্তের মধ্যে। ওর নি:শর্ত ভালোবাসার প্রকাশে আমি আপ্লুত। ও যে আত্মবিশ্বাসের সাথে আমাকে গ্রহণ করল, সেটা আমার ভালো লেগেছে। ও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে আমাদের বন্ধু হতে হবে।

পরের দিন আমাদের আবার দেখা হল। আমার এই সঙ্গীকে পেয়ে আমি অনেক দিক দিয়ে খুশি।

দিনের আলোতেও ওর সৌন্দর্যের কোন কমতি ছিল না-আক্ষরিক অর্থেই ওর চাইতে সুন্দর কাউকে আমি কখনো দেখিনি। স্বপ্নে দেখা মুখটা চিনতে পারার পরমুহুর্তের অনুভূতিগুলো তখন হারিয়ে গেছে।

ও-ও স্বিকার করেছে প্রথম দেখায় আমার মত ও-ও ভয় পেয়েছিল, আমার কাছ থেকে দূরে থাকার একটা ইচ্ছা জেগেছিল ওর ভেতরেও। এখন আমরা দু’জনই সেকথা মনে করে হাসি।


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

carmilla, story, episode, 3, series, english, translation, literature, thriller