সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

monalisa-da-vinci.jpg

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি রহস্যময় সেই হাসির জনকের কথা

তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের বহুমুখী প্রতিভা - ভাস্কর, স্থপতি, উদ্ভাবক, গণিতবিদ, লেখক, সংগীতজ্ঞ, শারীরবিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, ভূতাত্ত্বিক, ভ্রূণবিদ, উদ্ভিদবিজ্ঞানী। উড়ন্ত যানের নকশা এঁকেছিলেন, আবিষ্কার করেছিলেন জলগতিবিদ্যার সূত্র, আন্দাজ করেছিলেন টেকটোনিক প্লেটের ধারণা, আবিস্কার করেছিলেন সৌরশক্তি কেন্দ্রীভূত করার কৌশল, উদ্ভাবন করেছিলেন অভিনব সব সমরাস্ত্র, পর্যবেক্ষণ ও লিপিবদ্ধ করেছিলেন রক্তের সঞ্চালন, দৃষ্টিশক্তির রহস্য ও হাড়ের সংস্থান।

মোনালিসার হাসির রহস্য ভেদ করা সত্যিকার অর্থেই বড় কঠিন। ‘মোনালিসা’র হাসি সবার কাছে চির-রহস্যের আধার। বিশ্ববিখ্যাত চিত্রকর লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির এটি অন্যতম সেরা সৃষ্টি।

মোনালিসার মহান স্রষ্টা লিওনার্দোর জন্ম ১৪৫২ সালের ১৫ এপ্রিল ফ্লোরেন্সের অদূরবতী ভিঞ্চী নগরের এক গ্রামে। তার পুরো নাম লেওনার্দো দা সের পিয়েরো দা ভিঞ্চি।

লিওনার্দো ছিলেন ফ্লোরেন্সের এক নোটারী পিয়েরে দ্য ভিঞ্চির এবং এক গ্রাম্য মহিলা ক্যাটরিনার অবৈধ সন্তান। ধারণা করা হয়, তাঁর মা মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত দাসী ছিলেন। আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে লিওনার্দোর নামে কোনো বংশ পদবী ছিল না। ‘দ্য ভিঞ্চি’ দিয়ে বোঝায় তিনি এসেছেন ভিঞ্চি নগরী থেকে। 

লিওনার্দোর জীবনের শুরু সম্পর্কে খুবই অল্প জানা গেছে। ধারণা করা হয়, তাঁর জীবনের প্রথম ৫ বছর কেটেছে আনসিয়ানো'র একটি ছোট্ট গ্রামে। তারপর তিনি চলে যান ফ্রান্সিসকোতে তার পিতা, দাদা-দাদী ও চাচার সাথে থাকতে। তাঁর পিতা অ্যালবিরা নামে এক ষোড়শী তরুণীকে বিয়ে করেছিলেন। তিনি লিওনার্দোকে অনেক স্নেহ করতেন। কিন্তু অল্প বয়সেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

শৈশবের মাত্র দুটি স্মৃতি উদ্ধার করতে পেরেছিলেন লিওনার্দো। একবার তিনি দোলনায় শুয়ে ছিলেন। আকাশ থেকে হঠাৎ একটি চিল নেমে আসে দোলনার ওপর। পাক খেতে খেতে চিলটির লেজের পালক ছুঁয়ে যায় তাঁর মুখ। এ ঘটনায় তিনি পেয়েছিলেন অমঙ্গলের বার্তা। কিন্তু সব ধরণের অমঙ্গল আর দুর্দশা ঝেড়ে ফেলে মানুষটি হয়ে ওঠেন মানবসভ্যতার অন্যতম নির্মাতা।

১৪৬৬ সালে লিওনার্দোর বয়স যখন ১৪, তখন তিনি ভ্যারিচ্চিও’র কাছে শিক্ষানবীশ হিসেবে যোগ দেন। ভ্যারিচ্চিও’র পুরো নাম আন্দ্রে দাই সায়ন, তিনি ছিলেন সে সময়ের সফল চিত্রকর। ভ্যারিচ্চিও’র কর্মস্থলে তৎকালীন গুণী মানুষদের সমাগম হতো। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন -  গিরল্যান্ডিও, পেরুগন ও লরেঞ্জা দাই ক্রিডি। এখানে কাজ করে লিওনার্দো হাতেকলমে প্রচুর কারিগরি জ্ঞানার্জন করেছিলেন। তাঁর সুযোগ হয়েছিল কারুকার্য, রসায়ন, ধাতুবিদ্যা, ধাতু দিয়ে বিভিন্ন জিনিস বানানো, প্রাস্টার কাস্টিং, চামড়া দিয়ে বিভিন্ন জিনিস বানানো, গতিবিদ্যা এবং কাঠের কাজ ইত্যাদি শেখার। তিনি আরও শিখেছিলেন দৃষ্টিনন্দন নকশা করা, ছবি আঁকা, ভাস্কর্য তৈরি এবং মডেলিং।

১৪৭২ সালে ২০ বছর বয়সে লিওনার্দো ‘গির অব সেন্ট লুক’- এর পরিচালক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। এটি চিকিৎসক এবং চিত্রকরদের একটি সংঘ। কিন্তু তাঁর বাবা তাঁকে নিজেদের ওয়ার্কশপের কাজে লাগিয়ে দেন। ভ্যারিচ্চিও’র সাথে চুক্তি অনুসারে তিনি তাঁর সাথেও কাজ চালিয়ে যান।

ভাসারির মতে, লিওনার্দো সে সময়ের সেরা সংগীতজ্ঞ ছিলেন। ১৪৮২ সালে তিনি ঘোড়ার মাথার আকৃতির একটি বীণা তৈরি করেছিলেন। ১৪৮২ থেকে ১৪৯৯ সালের মধ্যবর্তী সময়ে তিনি মিলানে কাজ করেছেন। এখানে তিনি ভার্জিন অব দ্যা রকস্ এবং দ্যা লাস্ট সাপার ছবি দুটি আঁকার দায়িত্ব পান। 

১৪৯৩ থেকে ১৪৯৫ এর মধ্যে তাঁর অধিনস্তদের মাঝে ক্যাটরিনা নামে এক মহিলার নাম পাওয়া যায়। ১৪৯৫ সালে এ মহিলাটি মারা যান। সে সময় তাঁর শেষকৃত্যের খরচ দেখে ধারণা করা হয় তিনি ছিলেন লিওনার্দোর মা।

লিওনার্দো সম্পর্কে সারা বিশ্বে আলোচনার শেষ না থাকলেও এখনো পুরোপুরি তাকে জানতে পারেনি অনেকে। রহস্যময় লিওনার্দো বীণা বাজানোয় পারদর্শী ছিলেন। কেউ কেউ মনে করেন, ভিঞ্চি আসলে ‘মোনালিসা’ এঁকেছেন নিজের আত্মপ্রতিকৃতির আদলে।

ভিঞ্চি সম্ভবত সবচেয়ে বিখ্যাত বাঁহাতি। নোটবইয়ে সবকিছু লিখতেন উল্টো করে। কারও কারও অনুমান, এসব তিনি করেছেন তাঁর আবিষ্কার গোপন রাখার স্বার্থে। কেউ বলেন, চার্চের সঙ্গে বিরোধ বাঁধবে, এই আশঙ্কায়। রাতদুপুরে কবরখানায় ঢুকে তিনি লাশ কেটে দেখতেন। লিখে ও এঁকে রাখতেন চোখের গঠন, হাড়ের বিন্যাস, ভ্রূণের অবস্থা, রক্তসঞ্চালনের উপায়। আর খুঁজতেন, আত্মা কোথাও থাকে কি না।

তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের বহুমুখী প্রতিভা - ভাস্কর, স্থপতি, উদ্ভাবক, গণিতবিদ, লেখক, সংগীতজ্ঞ, শারীরবিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, ভূতাত্ত্বিক, ভ্রূণবিদ, উদ্ভিদবিজ্ঞানী। উড়ন্ত যানের নকশা এঁকেছিলেন, আবিষ্কার করেছিলেন জলগতিবিদ্যার সূত্র, আন্দাজ করেছিলেন টেকটোনিক প্লেটের ধারণা, আবিস্কার করেছিলেন সৌরশক্তি কেন্দ্রীভূত করার কৌশল, উদ্ভাবন করেছিলেন অভিনব সব সমরাস্ত্র, পর্যবেক্ষণ ও লিপিবদ্ধ করেছিলেন রক্তের সঞ্চালন, দৃষ্টিশক্তির রহস্য ও হাড়ের সংস্থান।

লিওনার্দো রেনেসাঁর অন্যতম প্রতীক। তিনি ইতালীয় রেনেসাসেঁর কালজয়ী চিত্রশিল্পী। লেওনার্দো দা ভিঞ্চির সম্পর্কে না জানলে তাঁর মহিমা আন্দাজ করা যাবে না। রেনেসাঁ সাংস্কৃতিক আন্দোলনটি জেগে ওঠেছিল চতুর্দশ শতকের ফ্লোরেন্সে; এর পর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে পুরো ইউরোপে। এ আন্দোলন ইউরোপকে টেনে বের করে আনে মধ্যযুগীয় ধর্মতন্ত্রের অন্ধকার থেকে।

লিওনার্দো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম চিত্রকরদের একজন। নোট বইয়ের এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘ছবি আঁকা কখনো শেষ হয় না, আঁকা এক সময় ছেড়ে দিতে হয়।’ তাঁর এ কথা ভিন্নতর অর্থে ফিরে এসেছে তাঁর নিজের জীবনে। তবে তাঁর বিখ্যাত মুদ্রাদোষ ছিল ছবি অসমাপ্ত রেখে দেওয়া। বহু চিত্রকর্ম তিনি আঁকতে শুরু করেছেন, কিন্তু শেষ করেননি। তাঁর সম্পূর্ণ চিত্রকর্মের সংখ্যা মাত্র ১৫টির মতো। এ সামান্য কয়টি চিত্রকর্মই তাঁকে আকাশচুম্বী খ্যাতি দিয়েছে।

শিল্প জগতের অমর এ শিল্পী ১৫১৯ সালের ২ মে মৃত্যুবরণ করেন।

এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

monalisa, da, vinci, leonardo, italy, painting, renaissance, smile