সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

Jahanara Imam.jpg

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম একাত্তরের ঘাতক দালাল বিরোধী আন্দোলনের অগ্রসেনানী

সেই থেকেই শহীদ জননীর মা মযার্দায় জাহানারা ইমামকে ভূষিত করা হয়। এছাড়া যুদ্ধের সময় তাঁর স্বামী, মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী, দেশপ্রেমিক শরীফ ইমামও ইন্তেকাল করেন।

এই দেশে যে কজন নারী তাদের কর্মের মাধ্যমে স্বরণীয় আছেন, তাদের মাঝে অন্যতম হলেন শহীদ জননী হিসেবে খ্যাত জাহানারা ইমাম, যিনি একইসঙ্গে কথাসাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ ও একাত্তরের ঘাতক দালাল বিরোধী আন্দোলনের নেত্রী। একাত্তরের ঘাতক দালালবিরোধী আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন।

তিনি ১৯২৯ সালের ৩ মে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে জন্ম গ্রহণ করেন। আজ তার ৮৮তম জন্মদিন। জাহানারা ইমামের বাবা সৈয়দ আবদুল আলী ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। মা সৈয়দা হামিদা বেগম। জাহানারা ইমাম ১৯৮২ সালে মাট্রিক পাস করেন।

১৯৪৪ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। বি.এ পাস করেন লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে ১৯৪৭ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে বি.এড ডিগ্রি অর্জন করেন । যুক্তরাষ্ট্র থেকে সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯৬৪ সালে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে ১৯৬৫ সালে বাংলায় এম.এ পাস করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

একাত্তরের দিনগুলি তার বিখ্যাত গ্রন্থ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন জাহানারা ইমামের বড় ছেলে শফি ইমাম রুমী। রুমী বেশ কয়েকটি সফল গেরিলা অপারেশনের পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে আটক হন। পাক হানাদাররা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। যুদ্ধবিজয়ের পর রুমীর বন্ধুরা জাহানারা ইমামকে সব মুক্তিযোদ্ধাদের মা হিসেবে বরণ করে নেন।

সেই থেকেই শহীদ জননীর মা মযার্দায় জাহানারা ইমামকে ভূষিত করা হয়। এছাড়া যুদ্ধের সময় তাঁর স্বামী, মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী, দেশপ্রেমিক শরীফ ইমামও ইন্তেকাল করেন। ১৯৮২ সালে তিনি মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। প্রতি বছর একবার যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হতো তাঁকে।

যুদ্ধাপরাধী ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকারীদের বিচারের জন্য ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি ১০১ সদস্যবিশিষ্ট একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয় জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে। তিনি হন এর আহ্বায়ক।

এর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ, ১৪টি ছাত্র সংগঠন, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক জোট, শ্রমিক-কৃষক-নারী এবং সাংস্কৃতিক জোটসহ ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে পরবর্তীতে ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ গঠিত হয়।

সর্বসম্মতিক্রমে এর আহ্বায়ক নির্বাচিত হন জাহানারা ইমাম। এই কমিটি ১৯৯২ সালে ২৬ মার্চ ’গণআদালত’ এর মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একাত্তরের নরঘাতক গোলাম আযমের ঐতিহাসিক বিচার অনুষ্ঠান করে। গণআদালাতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে দশটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত হয়।

১২ জন বিচারক সমন্বয়ে গঠিত গণআদালতের চেয়ারম্যান জাহানারা ইমাম গোলাম আযমের ১০টি অপরাধ মৃত্যুদন্ডযোগ্য বলে ঘোষণা করেন। ২৮ মার্চ ১৯৯৩ সালে নির্মূল কমিটির সমাবেশে পুলিশ বাহিনী হামলা চালায়।

পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হন জাহানারা ইমাম, এবং তাঁকে পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২৬ মার্চ ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা দিবসে গণআদালত বার্ষিকীতে জাহানারা ইমামের নেত্রত্বে গণতদন্ত কমিটি ঘোষিত হয় এবং আরো আটজন যুদ্ধাপরাধীর নাম ঘোষণা করা হয়। 

খুব দ্রুত শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকলে  জাহানারা ইমাম ২ এপ্রিল ১৯৯৪ সালে চিকিৎসার জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান ডেট্টয়েট হাসপাতালের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন। কিন্তু ২২ এপ্রিল চিকিৎসকরা জানান, চিকিৎসার আওতার সম্পূর্ণ বাইরে চলে গেছেন তিনি।

তাঁর মুখগহ্বর থেকে ক্যান্সারের বিপজ্জনক দানাগুলো অপসারণ করা আর সম্ভব নয়। বাকশক্তি হারিয়ে কথা বলা বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো তাঁর। এ সময় ছোট ছোট চিরকুট লিখে প্রিয়জনদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা চালিয়ে যেতেন।

২২ জুনের পর থেকে তাঁর অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে শুরু করে। সব ধরনের খাবার গ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসকরা ওষুধ প্রয়োগও বন্ধ করে দেন। ২৬ জুন ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টায় মিশিগানের ডেট্টয়েট নগরীর সাইনাই হাসপাতালের বেডে ৬৫ বছর বয়সে জাহানারা ইমাম শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

জাহানারা ইমাম বিভিন্ন সময় নানান পুরস্কার /পদকে ভূষিত হন। সেগুলো হলঃ

  • বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৮)
  • কমর মুশতরী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৮)
  • বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯১)
  • আজকের কাগজ হতে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা পুরস্কার (বাংলা ১৪০১ সনে)
  • নারী গ্রন্থ প্রবর্তনা (১৯৯৪)
  • স্বাধীনতা পদক (১৯৯৭)
  • রোকেয়া পদক (১৯৯৮)
  • অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার (২০০১)
  • ইউনিভার্সাল শিল্পী গোষ্ঠী পুরস্কার (২০০১)
  • শাপলা ইয়ূথ ফোর্স
  • কারমাইকেল কলেজ গুণীজন সম্মাননা
  • মাস্টারদা সূর্যসেন পদক
  • মুক্তিযুদ্ধ উৎসব-ত্রিপুরা সাংগঠনিক কমিটি
  • বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ
  • রোটারাক্ট ক্লাব অব স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ
  • বিশ্ববিদ্যালয় শিল্পী গোষ্ঠী পুরস্কার (২০০১)
  • বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংঘ
  • মুক্তিযুদ্ধের চেতনা
তার লেখা বিভিন্ন বই ও গ্রন্থ সমূহ হলঃ
  • নদীর তীরে ফুলের মেলা (১৯৬৬)
  • গজকচ্ছপ (১৯৬৭)
  • জাগ্রত ধরিত্রী (১৯৬৮)
  • তেপান্তরের ছোট্ট শহর (১৯৭১)
  • সাতটি তারার ঝিকিমিকি (১৯৭৩)
  • An Introduction to Bengali Language and Literature (Part-I)(1983)
  • বীরশ্রেষ্ঠ (১৯৮৫)
  • অন্য জীবন (১৯৮৫)
  • একাত্তরের দিনগুলি (১৯৮৬)
  • জীবন মৃত্যু (১৯৮৮)
  • বিদায় দে মা ঘুরে আসি (১৯৮৯)
  • শেক্সপীয়রের ট্রাজেডি (১৯৮৯)
  • নি সঙ্গ পাইন (১৯৯০)
  • বুকের ভিতরে আগুন (১৯৯০)
  • নাটকের অবসান (১৯৯০)
  • দুই মেরু (১৯৯০)
  • প্রবাসের দিনলিপি (১৯৯২)
  • ক্যান্সারের সঙ্গে বসবাস (১৯৯১)
  • বাংলা উচ্চারণ অভিধান (যৌথভাবে সম্পাদিত) (১৩৭৫)
শহীদ জননী জাহানারা ইমাম এর মত মানুষেরা ক্ষণজন্মা, কিন্তু এই সংক্ষিপ্ত জীবনীর মাঝেই তারা তাদের কর্মের মাধ্যমে মানুষের মনে আজীবন বেঁচে থাকবেন।

এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

শহীদ-জননী, জাহানারা-ইমাম, একাত্তর, যুদ্ধ, ঘাতক, জন্মদিন